একটি অতিমাত্রায় কাল্পনিক গল্প – বিষয় ঘুম

সময় রাত তিনটা ।

এই সময়ে আশেপাশে মানুষজন পাওয়া একটু কঠিন কাজই , তার উপর যদি পরদিন সকাল আটটায় উঠে ক্লাশ করার তাড়া থাকে তবে তো আর কথাই নেই । দুইটার সময়ই কাউকে সজাগ পাওয়া মোটামুটি ভাগ্যের ব্যাপার । রফিককে মানুষজন নিয়ে তেমন বেশী সংকিত মনে হল না । আগামীদিন দুইটা এসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে – সেই চিন্তাই আপাতত মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে । সেই সাথে একটা ক্লাসটেস্টের চিন্তা তো আছেই ।

রফিকের থাকার রুমটা দেখার মত । নীচতলার এককোনে একটা রুম , হলের এই ব্লকের দিকে সাধারণত অন্য ব্লকের কেউ আসে না । এইদিকের মানুষজনও অন্য ব্লকে সাধারনত যাওয়া আসা করে না । রুমটা সবসময়ই এতো শান্ত থাকে যে মাঝে মাঝেই মনে হয় এটা গ্রামের কোন মাটির ঘর । যেকোন মানুষ প্রথম দেখাতেই মন্তব্য করে ফেলে – “ঘুমানোর জন্য দারুন যায়গা তো” ।

কোন একটা কারণে গত কয়দিন ধরে রফিক একদমই ঘুমাতে পারছে না ।  কারণটা যে পড়াশোনা নয় সেটা সে ভালো করেই জানে । যে দুইরাত সে রাত জেগে পড়াশোনা করেছে সেটা সময় কাটানোর জন্য । কারণটা সে বের করার চেষ্টা করছে । অনেক ভেবে সে এটুকুই বের করল – সে কোন কিছু ভুল করছে , তার এখন করা উচিত না কিন্তু করছে । কিংবা তার উল্টোটাও হতে পারে – তার করা উচিত কিন্তু করছেনা  । সমস্যা হল ভুলটা যে কী সেটাই সে ধরতে পারছে না ।

অনেকক্ষন বই-পত্র নাড়াচাড়া করে রফিক একটু বাইরে বের হল খোলা বাতাসের জন্য । তার দুই রুমমেট অঘোরে ঘুমাচ্ছে । বাইরের আকাশের তারাগুলো ধূসর মেঘের আড়াল করে রেখেছে । এক তাবলিগের ভাইকে দেখা গেল তিন তলার বারান্দায় হাটাহাটি করতে । রফিক একবার শুনেছিল যাদের মনে শান্তি আছে তাদের নাকি ঘুমের কোন সমস্যা হয় না । ভাইয়ের কী সমস্যা সেটা ভাবতে ভাবতে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো । বেসিনে হাত দিয়ে দেখল পানি নেই । যাহ! সবাই একসাথে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসল নাকি ?

আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল-

কী দেখতে মজা লাগে ?

রফিককে পুরো অবাক করে দিয়ে আয়নার রফিক বলে উঠল – তা তো লাগবেই । আমার আমির সাথে কথা বলতে পারছি – কয়জনের ভাগ্যে সেটা হয় ।

রফিক জিজ্ঞেস করল – তুমি কে ?

আয়নার রফিক রহস্য করে জবাব দিল – সেটা তুমি নিজেও জানো আমি কে ? তবে তুমি এটুকু জানো না আমি এখানে কেনো । শোন , তোমার যখন শান্তির ঘুম থাকে তখন আমারও শান্তির ঘুম থাকে , আর তুমি যখন ঘুমাতে পারনা তখন আমার ঘুম ভেঙে যায় । আমাদের ঘুম সহজে ভাঙে না – কিন্তু ভেঙে গেলে আমাদের আমিকে খুজে বের করতে হয় । ভাগ্যিস তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে ! নাহলে যে কি হত , তোমার সামনে এখন মহাবিপদ ।

ঢং করোনা , তুমি আমার কল্পনা । আমার ঘুম নেই বলে চেতনা কাজ করছে না , সেজন্যই তোমাকে দেখছি ।

মুচকি হেসে আয়নার রফিক বলল –

তোমার তাই মনে হয় ? তাহলে বল কী করলে তুমি আমার অস্তিত্ব স্বীকার করবে ?

রফিক বলল – তাহলে আমার একটা কথার জবাব দাও , আমি কেনো ঘুমাতে পারছি না । আমি যদি তুমি হই তাহলে তুমি আমার জানা উত্তরের বাইরে কিছু বলতে পারবে না ।

এবার আয়নার রফিক হা হা করে হেসে উঠল । রফিকের মনে পড়ল আগে সে এমন করে হাসত । সামান্য বিষয় নিয়েই হাসতে হাসতে মাটিতে গড়িয়ে পড়া ছিল দুধ-ভাত ঘটনা । ইদানিং ঘুমের সাথে হাসিটও উধাও হয়েছে । হাসতে হাসতেই আয়নার রফিক বলল –

তোমার এই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই তো আমি এসেছি ।

রফিক সন্দেহের দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করল – সত্যি ? তাইলে বলছ না কেনো ?

শুনতে চাও ? – আয়নার রফিক ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল , মুখে আগের সেই মুচকি হাসি।

অবশ্যই !

ভড়কে যাবেনা তো ?

রফিক মুখ শক্ত করে বলল – না , আমি সহজে ভড়কাই না ।

এবার আয়নার রফিক মুখ শক্ত করে শুরু করল –

তুমি জানো তোমার উপর আমার কেমন রাগ হচ্ছে। তুমি তো আগে এমন ছিলে না। আমি তোমাকে নিয়ে গর্ব করতাম – দেখ আমার আমি কত ভালো । আর সেই তুমি জেগে জেগে স্বপ্নের জগতে ঘোরা শুরু করলে ? জেগে জেগে স্বপ্ন দেখলে ঘুম হবে কেনো ? মানুষ ঘুমায় স্বপ্ন দেখার জন্য আর জেগে থাকে সেই স্বপ্নের যন্ত্রণায়। তুমি তো এমনিই স্বপ্নের জগতে বাস করছ – তোমার যদি রাত জাগতে না হয় তবে কার জাগতে হবে বল ?

আচমকা এমন কথায় রফিক বড় ধরনের একটা ধাক্কামতন খেল । জড়ানো কন্ঠে জিজ্ঞেস করল – তু..তুমি এমন কেনো বলছ ?

হ্যা , আমি ঠিকই বলছি । তুমি তো জেগেও ঘুমিয়ে আছো । যে তোমাকে ভালবাসেনা তাকে তোমার সমস্ত চেতনায় ছড়িয়ে রেখেছ । একবারও কি ভেবেছ তোমার বাবা-মা তোমাকে কতটা ভালোবাসেন ? তোমার ছোট বোনেরা তোমাকে কতটা ভালবাসে ? তাদের ভালবাসার প্রতিদান দিতে চেষ্টা করেছো কখনও ? তুমি অন্ধ ! তুমি ঘোরের মাঝে আছো ! তোমায় জেগে উঠতে হবে … উঠতেই হবে । তোমার সমস্যাগুলোকে আর বাড়তে দিওনা … প্লিজ … প্লিজ … আমাকে আর জাগিয়ে রেখো না … আমাদের জাগতে কষ্ট হয় … অনেক কষ্ট হয় ।

রফিকের চোখ ঘোলা হয়ে আসল , এমন কথা শোনার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না । শুনতে শুনতে রফিক মাথা ঘুরে পড়ে গেল , পড়ার আগে ঘোলা চোখে দেখতে পেল আয়নার সে মুচকি মুচকি হাসছে ।

দিড়িম !

পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে দাড়োয়ান দৌড়ে আসল । পাজকোলা করে তাকে রুমে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল , রুমমেটদের ডেকে তুলল । জ্ঞান ফেরার পর রফিক তাদের জানাল রাতে খাওয়া দাওয়া হয়নি, সেজন্য মাথাটা একটু ঘুরেছে হয়ত। আর হাতে সামান্য ব্যাথা লেগেছে সেটাও তেমন কিছু না । এক রুমমেটের কাছ থেকে বিস্কুট পানি খেয়ে শুয়ে পড়ল । কাউকে ওয়াশরুমের ঘটনা কিছুই জানাল না । তার মনের ভেতর শুধু একটাই চিন্তা ঘুরতে লাগল , তার সমস্যার সমাধান করতেই হবে ।

রফিককে আর কখনও কোন ধরনের সমস্যায় ভুগতে দেখা যায়নি। তার জীবনের সব সমস্যা যেনো পানির মত সহজ হয়ে গেলো । ভালো ফলাফল করল , ভালো চাকুরি পেল । দুইটা ফুটফুটে বাচ্চা নিয়ে সুন্দর একটা পরিবার হল। আর জীবনসঙ্গিনী ? ঐযে যার কথা ভাবতে গিয়ে সব উলট-পালট হয়ে গিয়েছিল সে ই । রফিক কখনও ভাবেনি এমন করে তার মনের ইচ্ছাগুলো পুরণ হয়ে যাবে । মাঝে মাঝেই রফিক ভাবে – কত অদ্ভুত সুন্দর এই পৃথিবী, সবাই কেনো এই সৌন্দর্যের স্বাদ পায়না ?

 আয়নার রফিকের সাথে তার আর দেখা হয় নি । আয়নার সমানে দাড়িয়ে প্রায়ই সে জিজ্ঞেস করে – কেমন আছো আয়নার আমি ? একবার দেখে যাও তোমার জন্য আমি কতটা সুখে আছি । কেউ সে রাতের মত কথার জবাব দেয় না। কথা বলবে কেনো ? আয়নার রফিক এখন শান্তিতে ঘুমাচ্ছে যে ।

পুনঃ এই গল্পের একটা দুঃখি ভার্সন লিখে রেখেছি । কিন্তু যেহেতু প্রথম প্রকাশিত গল্প তাই সুখি ভার্সনটাই পছন্দ করলাম 🙂 রফিকসহ সবার চরিত্র এবং ঘটনা কাল্পনিক । যায়গায় বর্ননা আমার হল + রুম থেকে নেয়া । আরো ছোট করে লিখতে চাইছিলাম – হয়নি । 

পুনঃ পুনঃ আমি ভাষা ব্যবহারে তেমন দক্ষ না, আরো ভালো করে বললে আমি ভালো করে ভাষা ব্যবহারই করতে পারিনা। এই গল্পটা ভাষা ব্যবহার শেখার জন্য + কল্পনা আরেকটু বাড়ানোর জন্য লেখা । তাই সবরকম ভাষাগত ভুল , গল্পের ধরনগত ভুল ক্ষমা করে শুধরিয়ে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব 🙂

Advertisements

4 comments on “একটি অতিমাত্রায় কাল্পনিক গল্প – বিষয় ঘুম

  1. MAQ বলেছেন:

    আরে! বেশ সুন্দর তো! আমিও কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে আলাপ করার চেষ্টা করি। আলাপ-সালাপ কোনদিন দ্বিপাক্ষিক হয়ে গেলে আমিও – দিড়িম! 😛

    • Jamal Uddin বলেছেন:

      দিড়িম হলে তো সমস্যা ! তাহলে আপনার জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা থেকে দূরে থাকাই উত্তম 🙂

      অ.ট. আছেন কেমন ? অনেক ব্যস্ত ? আপনাদের এখানে সামার ভ্যাকেশন কখন ? অনেকদিন ধরে আপনার নিয়মিত উপস্থিতি মিস করছি ।

      • MAQ বলেছেন:

        এই ক’মাস এমএস থিসিস নিয়ে ভয়ানক রকম ব্যস্ত ছিলাম। আল্লাহর রহমতে এখন এমএস শেষ, দেশে আসলাম, বেশ ফুর্তিতেই আছি! 🙂

  2. সামু বলেছেন:

    ইন্টারেস্টিং!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s