দুই বছর আগের এই দিনেঃ আধখাওয়ার চাদের সাথে কুয়েটের পথে

১. পূর্বকথাঃ

ঠিক দুই বছর আগের কথা, চারদিকে ভার্সিটিগুলোর ভর্তি পরীক্ষা চলছে । দিন পনের আগেই বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা শেষ এবং চান্স পাব না ধরে নিয়েও আমি মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছি , খাচ্ছি-দাচ্ছি আর বরাবরের মত সাধ মিটিয়ে ঘুমাচ্ছি । কিন্তু সময় তো আর থেমে থাকে না , তাই আমাকে একটা নতুন এডভেঞ্চারের সুযোগ করে দেবার জন্য ৩০ তারিখের আগমন ঘটল । বলে রাখা ভাল ২০০৯ সালে ৩০ অক্টোবর বিকাল তিনটায় ছিল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ( Aka SUST ) এর পরীক্ষা এবং ৩১ তারিখ সকাল ১০টায় ছিল কুয়েটের পরীক্ষা । আমি ২৮ তারিখ রাত ১০ টার দিকে সিলেটে চাচার মেসেবাড়িতে চলে আসলাম, আধাঘন্টা DxBall (!) খেলে ঘুম দিলাম ।

২. ২৯ অক্টোবর ২০০৯, বৃহস্পতিবার

ঢাকায় কোচিং করার সময়ে যে হোস্টেলে থাকতাম সেখানের দুই বন্ধু মুরশেদ এবং যুবায়ের এই দুইজনও SUST এ পরীক্ষা দেবে , তাদের থাকার ব্যবস্থা আমার সাথেই করলাম । চাচার মেসে দুইটা রুম ছিল একটাতে চাচা থাকতেন আরেকটা দুই আঙ্কেল । ঘটনাচক্রে সেইদিন ছিল বৃহস্পতিবার এবং দুই আঙ্কেলের কেউই বৃহস্পতিবারে থাকতেন না ।

সুদূর রংপুর থেকে মুরশেদ এসে পৌছায় দুপুর ১০টার দিকে এবং যুবায়ের তারও কিছু পরে । মুরশেদ বাস থেকে নামার পরেই আমরা বাসের টিকিটের জন্য বেড়িয়ে পড়লাম – সমস্যা দেখা দিল কতক্ষণ পরীক্ষা হবে এ নিয়ে । SUST থেকে পরীক্ষার সময়ের ব্যাপারে কোন দিকনির্দেশনা ছিল না , সাথে বলে রাখা ভাল সেবারই প্রথম মোবাইল ফোন দিয়ে পরীক্ষার ফরম তোলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল । পরে টিকিট কিনব এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রুমে চলে আসলাম – রুমটা তিনজনের ঘুমানোর জন্য যথেষ্ট কিন্তু কম্পিউটার ছিল মাত্র একটা !

পরদিন ( ৩০ অক্টোবর ) পরীক্ষা , আমাদের কারো মাঝেই সেটা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা দেখা গেলো না । আমি বসে বসে চ্যানেল পাল্টানোর খেলা খেলতে লাগলাম , আর মুরশেদ আর যুবায়ের মিলে শুরু করল Need For Speed খেলা । বিকাল শেষে সন্ধ্যা গড়াল, রাত ৮ টার দিকে খবর আসল বুয়েটের রেজাল্ট নাকি দিয়ে দিয়েছে ! একদিকে নেট কানেকশন নেই অন্যদিকে কোন ভাইয়ের সাথেও আমার পরিচয়-টরিচয় নেই । অপেক্ষা করতে লাগলাম, দুই তিন কান ঘুরে রাত ৯টার ,সাড়ে ন’টার দিকে জানতে পারলাম বুয়েট আমাকে তার আঙিনায় পা রাখার অনুমতি দিয়েছে !

প্ল্যান ছিল আমি যুবায়ের একসাথে কুয়েটে পরীক্ষা দিতে যাবো । প্ল্যান চ্যান্জ করতে আমার মন সায় দিচ্ছিল না, আব্বাকে ফোন করলাম, রেজাল্ট শুনে তো আব্বা মহাখুশী । এতোটাই খুশি ছিলেন না ভেবেই হয়ত আমাকে খুলনা যাবার অনুমতি দিয়ে দিলেন । মানুষ অধিক শোকে পাথর হয়, আমি অধিক সুখে পাথর হয়ে গেলাম । আমার দুই বন্ধু তাদের গেমিং চালিয়ে যেতে লাগল ।

৩. ৩০ অক্টোবর ২০০৯, শুক্রবার

সারাদিনে আমার দুই বন্ধুর গেমিং কম্পিটিশন ছাড়া বলার মত আর কিছু হয়নি । পরীক্ষা হলের আশেপাশে জুম্মার নামাজ পড়ার প্ল্যান নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম । মনের আনন্দ দিয়ে পরীক্ষা দিলাম । কাগজপত্র সই, ছবি সংযুক্তকরণ ইত্যাদি ইত্যাদি কাজ করতে গিয়ে ৩ টার পরীক্ষা শুরু হল সাড়ে তিনটায় শেষ হল সাড়ে পাচটার কিছু পরে । আমি আর যুবায়ের যাবো খুলনা আর মুরশেদ যাবে ঢাকা , কিন্তু আমাদের কারো হাতেই কোন টিকেট নেই । অনেক ঘুরে এক কাউন্টার থেকে সাড়ে ৭টার একদম পেছনের ৩টা টিকেট ম্যানেজ করলাম । খুলনার টিকেটের কোন ব্যবস্থার কথা ভাবিনি , আগে ঢাকা পৌছাব সেটাই ছিল লক্ষ্য ।

বাসে উঠে বড় ধরনের গবলেট পাকিয়ে গেল , আমরা হয়ে গেলাম কাল্পনিক সিটের যাত্রী হয়ে গেলাম ! ঘটনাটা খুলেই বলি – সেদিন অনেক যাত্রির চাপ থাকবে ভেবে শ্যামলী পরিবহন তাদের দিনাজপুর-ঢাকা রুট থেকে কয়েকটা বাস সিলেট – ঢাকা রুটে নামিয়ে দিয়েছিল । এই দুই রুটের বাসের পার্থক্যটা হল দিনাজপুর-ঢাকা রুটের গাড়িগুলোতে থাকে ৩৬ টা সিট ( ৪টা করে ৯ টা সারি ) আর ঢাকা-সিলেট রুটের গাড়িগুলোতে থাকে ৪০ টা সিট ( ৪টা করে ১০ টা সারি ) । আমাদের কাউন্টার থেকে টিকেট দিয়েছে ১০ নাম্বার সারিতে যার অস্তিত্বই আমাদের বাসটাতে ছিল না ! অফিস থেকে আমাদের অনুরোধ ( যেভাবে বলেছিল সেটাকে ঠিক অনুরোধ বলা যায় না ) করল পরের বাসে যাবার জন্য – পরের বাসে গেলে আমার ক্যালকুলেশন গোলমাল লেগে যাবে তাই আমিও একদম সাফ জানিয়ে দিলাম আমি এই বাস ছাড়া যাব না । কন্ডাকটরের সাথে বিরাট ক্যাচাল বেধে গেল, আমিও গো ধরে বসে রইলাম । ভুল করেছি না শুদ্ধ করেছি সেটা জানিনা তবে এটুকু জানি যদি পরের বাসটাতে যেতাম তবে যুবায়েরের হয়ত আর কুয়েটে পরীক্ষা দেয়া হত না ।

সমস্যা সমাধান করে দিলেন ৩ সিলটি ভাই 🙂 তারা আমাদের জন্য স্বপ্রনোদিত হয়ে তাদের যাত্রা বাতিল করে আমাদের যায়গা ছেড়ে দিলেন । তারা কাউকে না জানিয়েই বাস ছেড়ে চলে যান তাই তাদের একটা থ্যাংকসও দেয়া হয়নি । তাদের কল্যানে আমরা ইমাজিনারি আসন থেকে একদম দ্বিতীয় সারিতে চলে আসলাম । যারা বাসে নিয়মিত ভ্রমন করেন তারা নিশ্চয়ই জানেন দুরপাল্লার বাসে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সারি হচ্ছে সবচেয়ে আরামদায়ক আসন ।

রাত ১ টার দিকে ঢাকা পৌছালাম, মুরশেদ নামল ফার্মগেটে আর আমরা কল্যানপুরে । নেমে তো আমার বন্ধুর মাথায় হাত , সবগুলো কাউন্টার ধুধু মরুভূমি । আমি বললাম – চল, গাবতলি যাই … কোন একটা ব্যবস্থা ইনশাল্লাহ হয়ে যাবে । ট্যাক্সি নিয়ে গাবতলী গিয়ে দেখি সেখানেও একই অবস্থা । যুবায়ের ফিরে যেতে চাইল , আমি বললাম – একটু দাড়াই , আমার মন বলছে বাস একটা পেয়ে যাবো । আমরা বড়জোড় মিনিট দশেক দাড়িয়েছিলাম , একটা পরেই একটা ভাঙাচোরা পত্রিকার বাস এসে হাজির ! একটু থামিয়ে ডাক দিলো – এই খুলনা ! খুলনা !! আড়াইশ টাকা !!! ঘড়িতে তখন বাজে প্রায় ২ টা ।

বাসে উঠে তো আমি তব্দা খেয়ে গেলাম, সারা বাস ভর্তি পত্রিকা । একেকটা পাইল ছাদ পর্যন্ত উচু । বাসের শক্ত ,সোজা সিটে একদম “এটেনশন!” মোডে বসে বসে বাইরের কালো অন্ধকার আর আকাশে উঠা আধ-খাওয়া চাদ দেখতে দেখতে ভরসা পেলাম – এই চাদের মালিক যিনি তিনি তো সাথে আছেন, সমস্যা কী ? ভাঙা বাস, নির্ঘুম রাত কোনটাই সমস্যা না । বাইরের ঝাপসা অন্ধকারে প্রকৃতি দেখে যে অনুভূতিটা হচ্ছিল তা বলে বুঝানোর মত ভাষা আমার কাছে নেই । আমি তখন জেনে গেছি আমার বন্ধুটির পরীক্ষা মিস হবে না !

রাত ৪টা / সাড়ে ৪টার দিকে বাস ঘাটে এসে থামল , নদী পার হতে হবে । আমরা যেখানটায় থেমেছি সেটা একটা নৌকা ঘাট, ফেরি ঘাটটা আমরা যেখানে দাড়িয়েছি সেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে । অনেক সময় নিয়ে বাসের সব পত্রিকা নামিয়ে শ্যালো ইন্জিনের নৌকাতে তোলা হল । সে সময়টাতে নদীর পাড়ে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঠান্ডায় কাপতে কাপতে আকাশের চাদটাকে দেখছিলাম । আমি জানিনা আর কখনও অমন পরিবেশে অমন করে চাদ দেখা হবে কিনা । বাস থেকে পত্রিকা নামানো, নৌকা দিয়ে পার হওয়া তারপর আর মাইক্রোতে উঠানো এই পুরো সময়টা আমি চাদ দেখার কাজেই ব্যস্ত ছিলাম । আমার বন্ধুটি কী করছিল সেটাও আমি খেয়াল করিনি । তবে আমার মনে হয় আমার সহযাত্রী ( আমার বন্ধু, আরেকটা মেয়ে আমাদের মতই পরীক্ষার্থী এবং তার বাবা-মা , আরো দুইজন ) কেউই আমার মত চাদ দেখার মোডে ছিলেন না । সবার ভিতরেই টেনশন – পৌছানো যাবে তো ?

ওপারে গিয়ে উঠলাম পত্রিকাভর্তি মাইক্রোতে , আমরা যে মাইক্রোতে উঠেছিলাম সেটা যাবে যশোর । যুবায়েরকে একটা ভালো যায়গায় বসিয়ে আমি পেছনে গাদাগাদি করে বসে গেলাম । রাস্তা ছিল প্রচন্ড ভাবে ভাঙা এবং এবড়োথেবড়ো , আমার প্রচন্ড তন্দ্রা এসেছিল এর মধ্যেও বুঝতে পারছিলাম গাড়ি গ্রামের মত কিছু একটার পাশ দিয়ে যাচ্ছে । আমি ঘোরের মত সব দেখছি, ঢুলছি এবং গাড়ির ঝাকির সাথে সাথে পেছনের জানালায় থাকা আড়াআড়ি স্টিলের বারটার সাথে মাথায় বাড়ি খাচ্ছি । সাড়ে সাতটার দিকে যখন আমরা যশোর পৌছাই তখন আমার মাথার বা-পাশ ফুলে ঢুল হয়ে গেছে, যদিও কথাটা এর আগে কাউকে বলা হয়নি 🙂

৩. ৩১ অক্টোবর ২০০৯, শনিবার

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সিনেমাহলটার পাশ থেকে আমাদের খুলনার বাসে উঠিয়ে দেয়া হল । আমি কন্ডাকটরকে কুয়েট আসলে ( যায়গাটার নাম বোধহয় ফুলবাড়িয়া মোড় ) নামিয়ে দিতে বলে ঘুমিয়ে পড়লাম । কুয়েটে এসে নামলাম সোয়া ৯ টার দিকে । আব্বুর অফিসের এক আঙ্কেলের শ্যালক ( যিনি আবার খুলনা ইউনিভার্সিটির ম্যাথের টিচার, নাজমুল স্যার ) তার এক প্রাক্তন ছাত্রকে বলে দিলেন আমাদের রিসিভ করার জন্য। উনার নাম ছিল রবি, আমি উনাকে একেকবার মামা ডেকেছি একেকবার ভাই ) আমরা উনার সাথে গেলাম, হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসলাম । সময় ছিল না বলে আমরা তাড়াতাড়ি যেতে চাইছিলাম । উনি আমাদের না খাইয়ে ছাড়বেনই না । উনার সাথে এমনভাবে কথাবর্তা হচ্ছিল যেনো আমাদের অনেক দিনের চেনা কোন বড় ভাই, ছোট ভাইদের পরীক্ষায় নিয়ে যাবেন ।

কুয়েট বাসার ঠিক পাশেই, হেটে যেতে মিনিট পাচেক লাগে । আমরা কুয়েটের মেইনগেটে পৌছালাম ঠিক ৯ টা ৫৮ মিনিটে । যারা কুয়েট চেনেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন গেট থেকে মূল একডেমিক এরিয়াতে যেতে লম্বা একটা রাস্তা আছে , আমাদের হাতে আছে ১ মিনিট । দৌড় দিলেও মিনিট পাচেক দেরী হবে , তার পর বিল্ডিং খুজে বের করার ঝামেলা তো আছেই । আমরা দৌড় দেবো কিনা ভাবছি , আর তাকিয়ে দেখছি একটা সাদা কার আসছে । কারটা ঠিক আমাদের কাছেই থামল , ভেতর থেকে এক ভদ্রলোক ( গাড়িতে উঠার পর বুঝেছিলাম আসলে কুয়েটের প্রফেসর ) বের হয়ে এসে বললেন – আররে … তোমাদের তো দেরী হয়ে গেল । বিল্ডিং আর রুম জেনেছো ? আমরা মাথা নাড়লাম । তিনি তাঁর ড্রাইভারকে বললেন আমাদের পৌছে দিতে ! বলেই হাটা শুরু করলেন । তখন পরীক্ষা শুরুর বেল পড়ে গেছে । স্যারকে আর মৌখিক ধন্যবাদটুকু জানাতে পারলাম না, গাড়িতে চেপে বসলাম ।

পরীক্ষার কথা আর নাই বললাম – সারা ক্লাস একদিকে সিরিয়াস ভঙ্গিতে পরীক্ষা দিচ্ছে আরেকদিকে আমি বসে বসে ঘুমাচ্ছি । ট্রেনে করে খুলনা থেকে আসার প্ল্যান ছিল, সেজন্য আরো দুইদন ছিলাম সেই টিচার মামার বাসায় । কিন্তু এই দিক দিয়ে ভাগ্য সহায় ছিল না – প্রথমদিন ট্রেনের টিকেট ছিল না আর পরদিন ছিল ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন । সময় পেলে একবার ট্রেনে যাবো বলে ঠিক করে রেখেছি , ঢাকা থেকে যাবো এবং পরপরই ফিরে আসব !

এই ভ্রমনে আমার কোন পুরাকীর্তি দেখা হয়নি, কোন বিখ্যাত যায়গায় যাওয়া হয়নি ; কিন্তু যে অনুভূতি হয়েছিল সেটাকে অসাধারণ বললেও কিছুটা কম বলা হয় – অসাধারণ সেই ভ্রমনের জন্য এটা হয়ত একদমই সাদামাটা একটা বর্ননা । যে আতিথেয়তা, সাহায্য আমি একদম অপরিচিত মানুষজনের কাছ থেকে পেয়েছি সেটা কখনও ভুলবো না । সেই সিলটি ভাইয়েরা, সেই স্যার যাদের জন্য ঠিকঠাকমত বন্ধুকে নিয়ে পরীক্ষার হলে পৌছাতে পেরেছিলাম তাদের ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আর জানা নেই । পরমকরুনাময় আল্লাহর কাছেও শুকরিয়া তিনি আমার জন্য এমন একটা শিক্ষা সফর রেখেছিলেন ।

সবার জীবন আনন্দ এবং এডভেঞ্চারময় হোক ।

নোটঃ এবছর কুয়েট আর SUST একই দিনে পরীক্ষা ।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s