চলচ্চিত্রের নাম “রানওয়ে”

সব নিয়মকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সারা দেশে প্রদর্শনি শেষ করে প্রয়াত তারেক মাসুদের পরিচালনা,  ক্যাথরিন মাসুদের প্রযোজনায় এবং মিশুক মনিরের চিত্রগ্রহনে চলচ্চিত্র রানওয়ের ঢাকায় প্রদর্শনি শুরু হল গতকাল ১০ ফেব্রুয়ারী । অনেক আগে বের হলেও এর কোন টিভি প্রদর্শনি হয়নি বলেই হয়ত ইন্টারনেট, টরেন্ট কোথাও এর কোন “ডিজিটাল” “পাইরেটেড” কপি  ছিল না । আজ পরীক্ষা ছিল, পরীক্ষা শেষ করেই ঠিক হল মুভি দেখতে যাবো । রানওয়ে নিয়ে সমালোচনা, আলোচনা করা কোনটার যোগ্যতাই আমার নেই ; তবে সাধারণ দর্শক হিসেবে বলতে পারি দুপুর ২:৩০ থেকে বিকাল ৫ টা পুরোটা সময় আমি চোখের পাতা ফেলতেও ভয় পেয়েছি – এই বুঝি কিছু মিস হয়ে গেল ।

মুভি ? সিনেমা ? ছবি ? রানওয়েকে কোনটা বলব – বাংলা, হিন্দি আর ইংরেজী চলচ্চিত্রকে আলাদা করে বোঝানোর জন্য মাঝে মাঝে একটা নিয়ম ফলো করা হয় । ইংরেজী চলচ্চিত্রকে “মুভি”, হিন্দি চলচ্চিত্রকে “সিনেমা” আর বাংলা চলচ্চিত্রের অবস্থা খারাপ বলেই হয়ত এর নাম “ছবি” ! হিন্দি সিনেমা দেখি না, রানওয়ে দেখে যেরকম অনুভূতি হয়েছে সেটা কোন ইংরেজি বা বাংলা কোন চলচ্চিত্র দেখেই হয়নি । এমন অসাধারণ কাহিনীর বুনন, ছবির চিত্রকল্প কিংবা ক্যামেরার কাজ সবকিছুই দেখে মনে হয়েছে – ” আরে ! এরকম কিছু তো আগে দেখিনি ! ” তাই রানওয়েকে সিনেমা, মুভি কিংবা ছবির কাতারে ফেলে অসম্মান করতে চাচ্ছি না – এর নাম রানওয়েই থাক …

রানওয়ের মূল নায়ক মাদ্রাসার আলীম শ্রেণী থেকে ঝড়ে পড়া আপাতত বেকার রহুল । মা, গার্মেন্টসে কাজ করা ছোট বোন আর অসুস্থু দাদুকে নিয়ে সংসার । বাবা ভিটে-মাটি সব বিক্রি করে বিদেশ চলে যাওয়ায় এসে আশ্রয় নিতে হয়েছে বিমানবন্দরের রানওয়ের উত্তরে কিছুটা খালি যায়গায় , ঘন্টার ঘন্টায় মাথার উপর দিয়ে যেখানে প্লেনের নামা-উঠা ।  ছোট বোনের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সমবায়ের ঋণের টাকায় কেনা গরু দুধ বিক্রি করা সত্ত্বেও সংসার চলে না । মাদ্রাসার ছাত্র হবার কারণে কোন কাজ না পাওয়া রুহুল তাই সবসময় কিছুটা হীনমন্যতায়ই ভুগে । একসময় সে জড়িয়ে পড়ে জঙ্গিবাদে । নিজের পরিবার, পছন্দের মানুষ সবার সাথে দূরত্ব তৈরি হয় – রুহুলের নিজের মাঝেই তৈরি হয় বড়সড় এক মানসিক সংঘাত ।

রানওয়ের পুরোটা সময় জুড়ে সংলাপ খুবই কম ছিল, মুখের প্রকাশভঙ্গিই বেশীরভাগ যায়গায় সব বলে দিয়েছে । এতো পরিমিতবোধের মাঝেও কিছু রুমান্টিক দৃশ্য ছিল দেখার মত – আমি আগেই বলেছি দেখে মনে হবে “এমনটা তো আগে দেখিনি !” আরেকটা জিনিস বলে দেই – বিমানের উঠা আর নামা ভাল করে খেয়াল করে দেখবেন – কখন কী হচ্ছে – উঠছে না নামছে ? বিষয়টা কাহিনীর জন্য প্রতিকী হিসেবে কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় ।

শুরুতে ক্যাথরিন মাসুদ প্রয়াত তারেক মাসুদ,  মিশুক মনির এবং অন্যান্য যারা সেদিনকার সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন তাদের কথা স্মরণ করলেন । পুরো হল জুড়ে তখন অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল, কিসের যেনো হাহাকার ছিল চারদিকে । তারেক মাসুদকে খুব মিস করছি, করব । মিশুক মনিরের কাজ আগে কখনও দেখা হয়নি – ক্যামেরার কাজে এতো কারিশমা থাকতে পারে আমার জানা ছিল না । ভাবতে কষ্ট হচ্ছে মিশুক মনীর কিংবা তারেক মাসুদের আর কোন কাজই আর কখনও দেখা হবে না ।

যদি সময় পান তবে চলে আসুন পাবলিক লাইব্রেরীতে , বিকাল ৩ টা, ৫ টা কিংবা ৭ টায় । রানওয়ের ট্রেইলার দেখুন নীচে –

ওহ! ক্যাথরিন মাসুদের আরেকটা একটা ম্যাসেজ পৌছে দেই, কেউ যদি তাদের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে রানওয়ে দেখাতে আগ্রহী হন তবে ভলান্টিয়ারদের সাথে যোগাযোগ করুন – রানওয়ে টীম পরে যোগাযোগ করে দেখানোর ব্যবস্থা করবে ।

আমাদের মুগ্ধতা আর বিষন্নতার মাঝে ফেলে চলে যাওয়া তারেক, মিশুকের জন্য ভালোবাসা রইল ।

Advertisements

11 comments on “চলচ্চিত্রের নাম “রানওয়ে”

  1. রিং বলেছেন:

    বহুদিন পরে খুবই ভালো লাগছে। চলচ্চিত্র “রানওয়ে” যে চমৎকার হবে সেটা ধারনা করতে পারছিলাম। কেননা তারেক মাসুদের বেশ কিছু কাজ আমি পূর্বেই দেখেছি। জহির রায়হান পরবর্তী বাংলা চলচ্চিত্রের জগৎটাকে উন্নততর অবস্থানে উন্নীত করবার মতো যোগ্যতা এই দুই কীর্তিমানেরই ছিলো।

    আপনার লেখার হাত বরাবরই ভালো। পড়ে ভালো লাগলো। তবে বানান এর বিষয়ে বিশেষ সতর্ক হোন জামাল ভাই। 😉

  2. “রানওয়ে” কেমন?- তা জানতে এ পোষ্ট পড়ার পর আর কারও মতামত নিতে হবে না।

    • Jamal Uddin বলেছেন:

      সময় পেলে সপরিবারে একবার দেখে আসতে পারেন ( যদি না দেখে থাকেন ) – পাবলিক লাইব্রেরীতে আগামী ২১ তারিখ পর্যন্ত চলবে ।

      লিফো বন্ধ হয়ে যাবার পর ঘরকুনো হয়ে গেছি আবার, কমিউনিটিতে যাওয়া-আসা কোনটাই করা হয় না বলে আপনাদের খবরাখবরও নেয়া হয় না । আছেন কেমন ?

  3. dihan91 বলেছেন:

    সিলেট অডিটরিয়ামে রানওয়ে দেখিয়েছিল ১বছর আগে। আমার জীবনে দেখা অসাধারন কিছু ছবির তালিকা তৈরি করলে এটি অনেক উপরেই থাকবে। ছবির দৃশ্যায়ন দেখেছ? বিশেষ করে মাথার উপর দিয়ে প্লেন যাওয়ার দৃশ্যগুলা? উর্দু ভাইর ট্রেনিং? সিনেমা হলে বোমা হামলা? আর ছবির কাহিনির সাথে আমার অতি ক্লোজ কিছু ফ্রেন্ডের সাথে মিলে যায় যারা ঠিক আলিমের মতই জঙ্গিবাদের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। তাই কাছথেকেই দেখা সবকিছু সেলুলয়েডের ফিতেই দেখে চমকে উঠেছিলাম।
    একেবারে অসাধারন।

    • Jamal Uddin বলেছেন:

      প্লেনের উঠানামার সাথের শটগুলো আসলেই অসাধারণ ছিল । ছবি দেখতে দেখতেই বার বার ভেবেছি – এতো নিখুত শট কিভাবে সম্ভব । একটা সাধারণ শট নিতেও তো ৩-৪ বার কাট করা লাগে সেখানে একদম প্লেনের উঠা-নামার সাথে, অবস্থান, সংলাপ, অভিব্যক্তি সব খাপে খাপে মেলানো এক শট নিতে না জানি কত যত্ন নিতে হয়েছে !

      যাদের হারালাম তাদের যায়গা পূরণ হবার মত না 😐

  4. Ether বলেছেন:

    Apnar Dekha Aaro Kichu Bangla Cholochitrer Naam Jante Chai……..
    Amra Ki Shudhu Making Dekhte Chai Naki Emon Kono Golpo O Dekhte Jai Jeta Amra Korini Ekhono, Vabini Ekhono?
    Eaishob To Amra Jene Ashchi, Poreashchi Kintu Uttoroner Poth Niye Ki Keu Vabbona? Shudhuii Ki Itihash, Ghote Jawa Ghotona Gulur Visualizeee Dekhe Jete Hobe?

    • Jamal Uddin বলেছেন:

      বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের যে অবস্থা তাতে যাওয়া ঘটনা, কিংবা সেগুলো কেন্দ্র করে তৈরি করা কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্রই হোক না আগে ; ধরুন আপনি ম্যাথ শিখছেন, যোগ বিয়োগ শেখার আগে যদি গুণ-ভাগ শিখতে চান তবে তো ঝামেলা বেধে যাবে , তাই না । এরকম একটা চলচ্চিত্র দেখেই হয়ত নতুন কোন কাহিনী কারো মাথায় আসবে, ক্যামেরার কাজ দেখে অন্য কেউ এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে চাইবে “এভাবে না করে ঐভাবে” করলে কী হয় ! উত্তরনের পথ নিয়ে আর কত ভাবা-ভাবি হবে ? সবাই তো ভাবেই, টক-শো, টিভি সব গরম করে ফেলে – কিন্তু কাজ কই ?

      বর্তমান ঢালিউড চলচ্চিত্র থেকে ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্রগুলোর জন্য রানওয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সেটা হল এর বিপনন – মুক্তি পাওয়া মাত্রই চলচ্চিত্রগুলো টিভিতে চলে যায়, এইটা খুবই খারাপ । তারেক মাসুদের স্বপ্ন ছিল দর্শক হলে গিয়ে সিনেমা দেখবে – রানওয়ে মানুষ হলে গিয়েই টিকেট কেটে দেখছে । ছোট ছোট সাফল্যই তো বড় সাফল্য আনে , তাই না ? আশাবাদী হতে দোষ কোথায় ?

      বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের ভাললাগা চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে একটা লেখা লিখার ইচ্ছে আছে, পরীক্ষার জন্য একটু ব্যস্ত – সময় করে উঠতে পারছি না ।

      ভাল থাকবেন ।

      পুনশ্চঃ আপনি খুব যত্ন নিয়ে ইংরেজী অক্ষরে বাংলা লিখেছেন, প্রতিটা শব্দের প্রথম অক্ষর বড় হাতের দেখে বললাম । কোন কারণে আমার ইংরেজি অক্ষরে বাংলা পড়তে কষ্ট হয় এবং পারতপক্ষে আমি পড়ি না । অভ্র, গুগল ট্রান্সলিটারেটর দিয়ে আপনি কিন্তু খুব সহজেই বাংলা লিখতে পারেন – চেষ্টা করে দেখুন 🙂

  5. Nahid বলেছেন:

    Jamal, তোমার ল্যাপটপের মডেল কি?

  6. ছবিটা দেখি নাই। ভাল লাগল।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s