গল্পঃ বৃষ্টি

সাতমসজিদ রোডে যাবো টিউশনি করাতে, সকাল সকালই বেরিয়েছিলাম । নরমালী যেভাবে যাই মানে হল থেকে বেরিয়ে পলাশী মোড়, সেখান থেকে ১৩ নাম্বার বাস ধরে একদম ছাত্রের বাসার সামনে – এভাবেই যাওয়ার জন্য পলাশী আসলাম । রোদ বেশ চাগিয়ে উঠেছিল তার মাঝেই আধা-ঘন্টা অপেক্ষা করে বাসের দেখা না পেয়ে শেষমেষ ঠিক করলাম আজিমপুর থেকেই যাবো । আজিমপুর মোড়ে যখন এসে দাড়িয়েছি তখন ঘড়িতে সাড়ে দশটা ।

আবারও সেই বাসের জন্য অপেক্ষা, তবে এবার সাথে যোগ হল ছাত্রের ফোন । তিন-চারবার ফোন দিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করে – “ভাইয়া, আপনি কোথায় আছেন এখন ?” , প্রতিবারই আমি বিষন্ন কন্ঠে জবাব দেই – “এইতো একটু, বাস পাচ্ছিনা তো , সেজন্য দেরী হচ্ছে” ; শেষবার ছাত্রের মা ফোন দিলেন – আমি জানালাম রিকশা নিয়ে শিঘ্রী আমি আসছি । কিন্তু বললেই কী হয় ? সেই দিনে একটা রিকশাও শঙ্করের দিকে যেতে রাজি হল না ! মনে মনে ভাবলাম – কোন কুক্ষণে যে বেরিয়েছিলাম ? কার মুখ যে দেখেছিলাম সেদিন !

কিছু না পেয়ে শেষ-মেষ মিরপুর ১ এর একটা বাসে উঠে স্কয়ার হাসপাতালের এখানে নামলাম , সেখান থেকে রিকশা নিলাম । রিকশা যাচ্ছে, আমি ব্যাগ কোলের উপর ফেলে মেজাজ খারাপ করে বসে আছি । রিকশাওয়ালা আস্তে আস্তে টানছে দেখেও বেশ মেজাজ খারাপ লাগছে ; ধমক লাগাতে ইচ্ছে করছিল না – বুড়ো মানুষ, কী ই বা করার আছে ।

রিকশা ৬/এ থেকে মেনরোডে উঠবে , আর একটু এগুলেই আমার গন্তব্য ঠিক সে মূহুর্তেই ঘটনাটা ঘটল ।

রাস্তার মুখে থাকা ট্রাফিক পুলিশ হঠাৎ করে সব গাড়ি থামিয়ে দিল, হঠাৎ করে বলছি এই কারণে যে রাস্তা ফাকাই ছিল, ছেড়ে রাখলেও কোন ক্ষতি ছিল না । কিন্তু কপালের লিখন বলে একটা কথা আছে না ? সেই কপালের লিখনের ফেরেই (কিংবা জোরে) হয়ত ট্রাফিক গাড়ি থামাল আর পেছন থেকে আসা কারটা জোরে একটা ধাক্কা মারল । আমি ছিটকে সামনের দুই রিকশার মাঝে পড়লাম, রিকশাওয়ালাও সামনের রিকশার চাকার সাথে পায়ে ঘষা খেল ।

আমি একটু অন্যমনষ্ক ছিলাম ঠিক তবে এতোটা ছিলাম না বলেই বড় ধরনের কোন ব্যাথা পাইনি, শুধু হাত দুই পাশ ছিলে গিয়েছিল, মাথায় একটা বড় আলু বের হয়েছিল । সেই মূহুর্তে আমার মাথা পুরো খালি খালি লাগছিল, তবু উঠে দাড়ালাম । ততক্ষণে চারপাশে মানুষ জমে গেছে, ট্রাফিক মিয়াও চলে আসছে  – কেউ কিন্তু আমার কাছে আসে নি, কিংবা বুড়ো রিকশাওয়ালার কাছে যায় নি ! সবাই ঘিড়ে দাড়িয়েছে ঐ কারটাকে ! মার মার কাট কাট অবস্থা ! আমাদের দেশের মানুষ যে ঝামেলা পছন্দ করে সেটা সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম ।

যাই হোক মূল ঘটনায় আসি, আমি গাড়ির দিকে কাপাকাপা পায়ে এগিয়ে গেলাম, ড্রাইভারকে কিছু একটা বলতে যাবো এমন সময় গাড়ির পেছনে চোখ গেল । “পরীর মত সুন্দর” “অপ্সরী” “টানা টানা হরিণের মত চোখ” “দিঘল কেশ” – লেখক হলে এমন অনেক উপমাই হয়ত ব্যবহার করতাম, বাংলা শব্দ-ভান্ডারের শেষ পর্যন্ত হয়ত নিংড়ে নিতাম কিন্তু আফসোস আমি তেমন কেউ না । গাড়ির পেছনে ভয় মেশানো যে মুখখানি আমি দেখেছিলাম সেটা আজও একদম ঝকঝকে কাচের মতই স্বচ্ছ । ভুলে গেলাম আমার আলু-উঠা কপাল, ছিলে যাওয়া হাত আর আচড় লাগা গাল – সবাইকে সরিয়ে দিয়ে গাড়িটাকে চলে যেতে বললাম । সবাই মনে হয় একটু হায় হায় করে উঠেছিল – কিন্তু আমার তখন সেদিকে মনে নেই । মিনিটের ভেতর ঘটে যাওয়া ঘটনায় আমি কী করব না করব সেটাও বুঝে উঠতে পারছিলাম না, মনের ভেতর শুধু মেয়েটার ভয় মাখা চেহারা ।  তক্ষুনি মনে হল কোন ঠিকানা ফোন নাম্বার কিছুই তো রাখলাম না ! গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছি তো আছিই … চোখের আড়াল হবার ঠিক আগ মুহূর্তে চোখ গেল লাইসেন্স প্লেটের দিকে – সেখানে লেখা ছিল Dhaka Metro Pa 52279.

এর পরের কাহিনী বড় করে বলার মত অবস্থায় আমি নেই, তাই ছোট করেই বলি –  একটা জরুরী কাজে বাড়ি চলে যাই সেদিনই । পরের সপ্তাহে এসেই ঘুষ-টুষ দিয়ে গাড়ির মালিকের ঠিকানা বের করি – যায়গাটা আমার ছাত্রের বাসার কাছেই ছিল, এতো কাছে যে হয়ত বাড়ি না গেলে আরো একটিবার দেখা হয়ে যেত । আমি বড্ড দেরী করে ফেলেছিলাম, গিয়ে শুনলাম তারা সবাই দেশের বাইরে গিয়েছেন । আমি কারণ জানতে চাইলাম না, ফিরে এলেই দেখা হবে – এই ভেবে । প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে একবার খবর নিতাম তারা ফিরল কিনা । দাড়োয়ান বড় সহজ-সরল লোক ছিল, আমাকে কেনো যেনো সে আপন করেই নিয়েছিল – হয়ত একবেলা নাস্তা করাতাম দেখে, সাথে দুইটা বেনসন । আলাপ বলতে খালেদা জিয়া আর শেখ হাসিনা – এই । খাতিরটা কোন পর্যায়ের ছিল বুঝতে পারিনি, এখনও বুঝতে পারিনা – নাহলে এপ্রিলের এক বৃষ্টি ভেজা সকালে সে ফোন দিবে কেনো ? কেনোই বা কান্নাভেজা গলায় জানাবে তার আপা আর নেই !

মোবাইল পড়ে গেল, আমার জগত তখন শূন্য ! মনে হচ্ছিল মহাবিশ্বের যেখানে শেষ তার বাইরে যে শূন্যতা সেখানে আমি দাড়িয়ে আর আমার চারদিকে বৃষ্টি হচ্ছে । সে বৃষ্টি আমি শুনছি কিন্তু দেখতে পারছি না ধরতে পারছি না । সেই এপ্রিলের টার্ম ফাইনাল আমার আর দেয়া হয়ে উঠেনি ।

তার কিছুদিন পরে সেই ফ্যামিলি পাকপাকিভাবে ইংল্যান্ডে শিফট করে, গাড়িটারও মালিক বদল হয় । গাড়িটা কেনার চেষ্টা করেছিলাম , পারিনি ।

এটুকু বলে “নিজের কাহিনী” অংশের সর্বশেষ বক্তা রিফাত ভাই একটু থামলেন – “ফ্লোর র‌্যাগের এই আনন্দের মাঝে তোরা আমার কাহিনী শুনতে চাইলি , আমার কাছে এই একটাই কাহিনী । কেউ মন খারাপ করিস না । মৃত্যু থেকে কারো রেহাই নাইরে !” পুরো বারান্দা তখন থমথমে – একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে শুকনো হাসি হেসে রিফাত ভাই বললেন – “মজার ব্যাপার কী জানিস ? তার নাম ছিল বৃষ্টি !”

১ মার্চ ২০১২

Advertisements

11 comments on “গল্পঃ বৃষ্টি

  1. Md. Abul Hayat বলেছেন:

    🙂 অনেক সুন্দর লিখেছ …

  2. tusin বলেছেন:

    খুব ভাল লাগল………:)

  3. sinadim বলেছেন:

    গল্পঃ na likhe bola uchit silo” jibon theke neya”

    • Jamal Uddin বলেছেন:

      জীবন তো ভাই গল্পের চেয়েও আরো আকর্ষণীয় 🙂 জীবনের সাথে গল্পের তুলনা কী চলে . বলেন ?
      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ , ভাল থাকবেন 🙂

  4. অর্ণব বলেছেন:

    অসাধারণ…

  5. Abuzor Gifary বলেছেন:

    সুন্দর…

  6. আহনাফ বলেছেন:

    কেন জানি কখনো টেঁকি অনুছেদ ছাড়া পড়ি না , আপনার এই গল্পটা পড়ে বেশ ভাল লাগল।

    • Jamal Uddin বলেছেন:

      শুনে ভালো লাগল । সত্যি বলতে একটা সময়ে টেকি কিছু ছাড়া লিখতাম না, হঠাৎ করে কেনো যেনো টেকি লেখার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি । কিছুদিন ধরে আবার শখ চাগিয়ে উঠেছে ঠিকই কিন্তু মনমত হচ্ছে না । দেখা যাক !
      ভাল থাকবেন ।

  7. powerfulstar89 বলেছেন:

    😥 😥 😥
    জীবনটা ছায়াছবির চেয়ে কোন অংশে কম না 😦

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s