কালবৈশাখীনামা – ১

বৈশাখে আম কুড়ানোর সৌভাগ্য তেমন বেশি হয়নি, নিজের উপর দোষ চাপিয়ে যদি বলি তবে বলতে হবে সুযোগ নেই নি । কিন্তু কালবৈশাখীর অভিজ্ঞতা তেমন একটা খারাপ না বলতেই হবে – বিশেষ করে খোলা হাওরের মাঝে কালবৈশাখীর কবলে পড়ার কথা যদি ভাবেন । ঘটনাটা খুলেই বলি –

২০১০ সালের এপ্রিলের কথা । ক্লাশ শুরু হবে হবে করছে, তাই ভাবলাম নানু বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসলে মন্দ হয়না । তাছাড়া তখন নানু বাড়িতে কে যেনো মেহমান ছিল ( অতি সবল মেমরির কারণে সেটা মনে করতে পারছি না ) – সেটাও একটা কারণ । আরো বড় কারণ আমার আব্বা-আম্মা মনে করেন আমি সোশ্যাল ব্যাপারে দুর্বল ( আমি অস্বিকার করছি না ) – যাই হোক এই স্যোশাল ডিটেইলসগুলো জগাখিচুরী পাকিয়ে আছে তাই আর বেশি ভেতরে যাচ্ছি না । তবে পুরো চিত্রটা বোঝার জন্য নানু বাড়ির রাস্তার বর্ণনা দেয়া আবশ্যক !

আমার নানুবাড়ি বানিয়াচং থানা থেকে মাইল চারেক পূর্বে । হাওরের মাঝ দিয়ে হাটা রাস্তা, মাঝে শুটকী নামে একটা নদীও পার হতে হয় । নদীর খানিকটা আগে একটা ভাঙা ঘর আছে – ফাল্গুনের দিকে দোকান থাকে চৈত্রের শেষে বন্ধ হয়ে যায় । নদী পার হওয়ার জন্য মাঝে মাঝে নৌকা থাকে তবে খরচ না করতে চাইলে সেল্ফ-সার্ভিস বাশের তৈরি ভেলাও আছে । আর আগে যেমন বলেছি চারদিকে হাওড় – পাকা ধানের রংয়ে একদম হলুদ, আর সপ্তাহখানেক পরেই কাটা হবে এমন অবস্থা ।

যেদিনের কথা সেদিন সকালে মামার সাথে বানিয়াচং এসেছিলাম – এমনি । মামার কিছু কাজ ছিল সেগুলো সেরে মামার বন্ধুর সাথে বসে অনেকক্ষন আড্ডাটাড্ডা মেরে যখন বাড়ির পথ ধরেছি ( পায়ে হেটে অবশ্যই ) তখন প্রায় সাড়ে বারোটা- পৌনে একটা । আকাশের গুমোট অবস্থা দেখে মামাকে বেশ কয়েকবার আসন্ন ঝড়ের কথা বলার চেষ্টা করলাম। মামা পাত্তাই দিলেন না।

মামার সাথে সাথে হাটছি। মামা একটু আস্তে হাঁটেন, কিংবা আমি একটু দ্রুত হাঁটি বলে মামার সাথে তাল মিলিয়ে আস্তে আস্তে হাটতে হচ্ছে । দুইপাশে ধানক্ষেত। হলুদ ধানক্ষেতে উথাল পাতাল হাওয়ার নাচন, অনেক দূর থেকে ভেসে আসা ধানক্ষেতের ঢেউ, বাতাসে কালবৈশাখির গন্ধ – অন্যরকম মোহনীয় একটা পরিবেশ। হাওরের মাঝখানে কালবৈশাখীতে পড়ব – এই ভয় তখন মন থেকে উবে গেছে। কিন্তু সুখ বেশীক্ষণ সইল না। অনেকটা ম্যাজিকের মত একদম হঠাৎ করে বাতাস-টাতাস একদম থেমে গেল। চারদিতে কবরের মত শুনশান নিরবতা, থমথমে আবহাওয়া। বুঝতে সমস্যা হল না – ঝড় বাবাজি উপস্থিত। নদীর কাছের সেই ভাঙা ঘরটা থেকে আমরা তখনও মিনিট পাচেকের দূরত্বে।

আগে যেমন হুট করে সব থমথমে হয়ে গিয়েছিল এবার আর তেমনটা হল না। একদম চোখের সামনে দেখতে পেলাম বহুদূরের গ্রামের গাছপালা সব কাপিয়ে, ঠিক বাঘের মতই হুঙ্কার ছেড়ে কালবৈশাখি এগিয়ে আসছে। একদম খোলা হাওড়ে ঝড় আসার দৃশ্যটা খানিকটা অতিপ্রাকৃতিক, এবং ভয়াবহ সুন্দর। দৃশ্যটা ব্যাখ্যা করা কঠিন, তাই উদাহরণই ভরসা – Pirates of the Caribbean – At Worlds End মুভিতে একদম শেষে একটা ঝড়ের দৃশ্য আছে । সেটা যদি কেউ দেখে থাকেন তবে বৃষ্টির পানি আর বাতাস মিলে বাতাসে যে ঢেউয়ের সৃষ্টি করে সেটা চোখে পড়ার কথা। ব্যাপারটা ছিল অনেকটাই এরকম, শুধু পার্থক্য হল মুভিতে নীচে ছিল পানি আর এখানে ধান ক্ষেত। মুভিটা দেখেছি ল্যাপটপের সামনে বসে, আর ঝড়টা দেখেছি একদম ঝড়ের মাঝখানে পড়ে। ঝড়ের প্রথম ঝাপটা খেতে খেতে সেই ভাঙা ঘরে পৌছুলাম যেখানে আমি আর মামা ছাড়া আরো দুইজন ছিলেন – একজন দিনমজুর, আরেকজন হুজুর।

ভাঙা ঘরটাকে যখন এসে পড়লাম তাই সেটারও একটা বর্ণনা দেয়া উচিত। ছন দিয়ে ছাওয়া বাশের সেই ঘরটা বড়জোড় ৮ ফিট বাই ৬ ফিট হবে, একপাশে ছন কিছুটা খসে পড়েছে। শন আর মাটি দিয়ে বানানো একদিকের দেয়ালের অবস্থাও করুণ। মড়ার উপর খড়ার ঘা হিসেবে সেদিক থেকেই ঝড় এসেছে । বসার যায়গা না থাকায় আমরা যবুথবু হয়ে ভেতরে দাড়িয়ে আছি। দিনদুপুরেই বাইরে অন্ধকার হয়ে এসেছে, সেই অন্ধকারে কারো মুখে কোন কথা নেই – শুধু একটা হুলো বিড়াল পিট পিট করে তাকিয়ে ছিল আমাদের দিকে, দৃষ্টিটা ছিল ভয় মেশানো।

ঝড়ের প্রথম পর্বে থাকে একটা দমকা হাওয়া, সাথে খানিকটা বৃষ্টি । এই অংশটা সাধারণত তেমন ভয়াবহ না। কিন্তু এর পরের পর্বে যখন একসাথে প্রচন্ড দমকা হাওয়া আর তুমুল বৃষ্টি একসাথে আসে সেই মুহূর্তটা আসলেই ভয়াবহ। এই সময়ে বাতাস অনেক বেশী ভারী থাকে, তাই ধাক্কাটাও অনেক বেশি হয়। ঝড়ের এই অংশটা যখন শুরু হল তখন আমাদের মাথার উপরের ছাদ উড়ে যাওয়ার জোগাড়। আমরা সবাই ভয় পেয়ে গেছি। ঝড়ের ঝাপটায় যদি ছাদ উড়েই যায় তবে বিরাট বিপদ হয়ে যাবে।  তাই শেষমেষ কোন উপায় না দেখে আমি আর মামা মিলে ছাদের একপাশে ঝুলে পড়লাম যেনো ছাদ উড়ে না যায়, হুজুর দোয়াদুরুদ পড়া শুরু করলেন আর দিনমজুর চাচা দেয়ালটাকে ঠেস দিয়ে রাখলেন যেনো পড়ে না যায়। মনের মাঝে আরো একটা ভয়ও ছিল, বিদ্যুতপৃষ্ঠ হবার ভয়। যে ঘরটাতে ছিলাম সেটা মোটামুটি উচু যায়গায়, হাওরের মাঝে ঐরকম উচু যায়গায় বিদ্যুতপৃষ্ঠ হবার বেশ ভালো সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু ঐ যে উপরে একজন থাকেন তিনি কোন কারণে বাচিয়ে দিয়েছেন।

ঝড়ের এই অংশটুকু শেষ হওয়ার পরেই শুরু হল শীলা বৃষ্টি। বাতাস তখনও বেশ ভারী, বৃষ্টির বদলে পড়ছে শীলা। প্রথমদিকে ছোট ছোট শীলা দেখে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না, অনেকবারই দেখেছি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দৃশ্য পাল্টে গেল – এতো বড় বড় শীলা পড়তে লাগল যে নিজের চোখকে বিশ্বাস করানোটাই কষ্ট হচ্ছিল। ৩-৪ ইঞ্চি ডায়ামিটারের ঐ শীলাবৃষ্টির মাঝে কিভাবে যে ঘরটা টিকে ছিল সেটা বলা মুশকিল। কিন্তু ঘর টিকে থাকলেও মাঠের ধানগুলো ছাড়া পায়নি। মনে হচ্ছিল অদৃশ্য একদম মানুষ ধানগাছগুলোর উপর লাফাচ্ছে আর ধানগাছগুলো মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। দৃশ্যটা কল্পনা করা যেমন কঠিন, এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করাটাও কঠিন।

আধাঘন্টার মত তান্ডবলীলা চালিয়ে যখন ঝড় থামল তখন চারদিকের ধানক্ষেতের অবস্থা নাজেহাল। রাস্তার মাঝে কিছু গাছ ছিল, তাদের কয়েকটা ভেঙে গেছে। বাড়ির দিকে যেতে যেতে দেখলাম শীলার আঘাতে নতুন একটা বাড়ির চল একদম দুমড়ে মুচড়ে গেছে। নদীতে দুইটা নৌকা ছিল, সেগুলো ধাক্কায় পাড়ে উঠে গেছে। সেদিন বাড়ির উঠানো পা দিয়ে যে শান্তি লেগেছিল সেটার অনুভূতি ছিল এককথায় অসাধারণ।

আমাদের বাচিয়ে দেয়া ঘরটার দরজা ছিল ঝড়ের ডাউনস্ট্রিমে, তাই দরজা না থাকায় কোন সমস্যা হয়নি। বরং একদিকে ভালোই হয়েছে। পুরোটা সময় আমি প্রকৃতির এই ক্ষমতা প্রদর্শনি দেখার জন্য দরজা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পুরো সময়টাত নিজেকে কী পরিমাণ ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল সেটা বলে বুঝানো মুশকিল। যখন ঘরের চাল উড়ে যেতে চাচ্ছিল, চোখের সামনে আকাশ থেকে লাল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নেমে আসছিল – আমি ভেবেছিলাম আমি মারা যাচ্ছি। শীলাবৃষ্টির সময় যখন আমাদের সাথে থাকা হুজুর আর দিনমজুর চাচা উচ্চকন্ঠে আজান দিচ্ছিলেন তখন আমার যে মনের অবস্থা ছিল সেটা আজো মাঝে মাঝে ভাবি, লিখার চেষ্টা করি – কিন্তু সেই অনুভূতিকে প্রকাশ করার মত একটা অক্ষরও খুজে পাইনা।

সেই ঝড়ে বানিয়াচংয়ের ফসলের বিশাল ক্ষতি হয়েছিল, কিন্তু কেউ মারা যাবার ঘটনা ঘটেনি। তার কিছুদিন পরেই আরেকটা ঝড়ে পড়ে সেটাও দেখে ফেলার দুর্ভাগ্য হয়, সে গল্প আরেকদিন বলব।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s