দাদুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী

আজ ১০ এপ্রিল। ঠিক এক বছর আগে বিকাল পৌনে তিনটার দিকে বাড়ি থেকে খবর পাই আমাদের সবার প্রিয় দাদু আর নেই। দাদুর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গরীব-দুস্থ সহ সবাইকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল গত ৫ তারিখ, শুক্রবারে। রাজনৈতিক কর্মসূচির ফাঁদে পড়ে ঢাকায় বসে কো’রান পড়া ছাড়া আর কোন ভাবেই অনুষ্ঠানে শরীক হতে পারিনি।

পিছনে যতবারই ফিরে তাকাই, দাদুকে নিজ হাতে কবরে শুইয়ে দিতে পেরেছি ভেবে একটা স্বস্তি নিজের ভেতর চলে আসে। যতদূর মনে পড়ে, ভার্সিটিতে এই-ঐ নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়েছে মাত্র। তার মাঝেও যখন রেজিস্ট্রেশন এর তারিখ দিলো তখন আনুসাঙ্গিক ফী দেবার জন্য ৮ তারিখের দিকে ঢাকায় চলে আসলাম। ১৬ এপ্রিল ক্লাস শুরু হবে, ইচ্ছে ছিল আর বাসায় না ফিরে একটু ঘুরাঘুরি করে কাটানোর। ভালোই কাটছিল – ৯ তারিখ বিকেলের দিকে হঠাৎ অস্বস্তি লাগা শুরু হল। বিকালের জার্নি আমার অপছন্দের, একদিন দেরী করে হলেও সকালে জার্নি শুরু করতেই আমি বেশী পছন্দ করি। কিন্তু তারপরও কোন অজানা কারণে বাসায় চলে যাওয়া দরকার মনে হওয়ায় বিকেলেই কোনরকমে হবিগন্জের শেষ বাসে চেপে বসলাম। বাসায় পৌছালাম রাত ১০ টার দিকে। এপ্রিল মাসের প্রচন্ড ধুলাবালির পরও বাসায় ফিরে খুব উৎফুল্ল লাগছিল। পরদিন, ১০ এপ্রিল। বিকালের খাবার খেতে বসেছি মাত্র। হঠাৎ মধু চাচা ফোন দিলেন – জানালেন দাদুর অস্বস্থি লাগছে, সম্ভবত পেটে গ্যাস হয়েছে। জিজ্ঞেস করলেন আমরা আসব কী না। চাচা কল রাখার ৩ মিনিটের মাথায় ইমদাদ চাচা ফোন করলেন আমরা যেনো চলে আসি, দাদু আর নেই।

দাদু মারা যাবার সময় শুধু ইমদাদ চাচা-চাচী, মধু চাচা পাশে ছিলেন। শেষ সময়টুকুর যে বর্ণনা শুনেছি চাচার কাছে, সেটা একটু উল্লেখ করতে চাচ্ছি – আমার দাদু খুব কম খেতেন, কিন্তু পা-ব্যাথা ছাড়া শারীরিক কোন সমস্যা দাদুর ছিল না। ‌১০ তারিখ দুপুরে দাদু গরম-পানি দিয়ে গোসল করেছেন, নামাজ পড়েছেন, দুধ-কলা দিয়ে ভাত খেয়েছেন। আড়াইটার দিকে চাচাকে বলেছেন উনার খানিকটা অস্বস্থি লাগছে। সেটা শুনে চাচী পিঠ মালিশ করে দিতে চাইলেন, কিন্তু দাদু না করে দিলেন। চাচা খানিকটা জোর করেই দাদুকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মধু চাচাকে ডেকে আনলেন। মধু চাচা সব দেখে আমাদের ফোন দেবার জন্য বাড়ি থেকে শুধু বের হয়েছেন, তখন দাদু বললেন উনাকে একটু বারান্দায় নিয়ে যেতে। বিছানা থেকে উঠে দাদু ভাল করে পড়নের শাড়িটা গুজে, মাথায় ঠিকঠাকমত কাপড় দিয়ে বারান্দায় এসেই কালেমা পড়ে ঢলে পড়লেন। কোন কষ্ট নেই, শারীরিক যন্ত্রণা নেই – যেনো বারান্দায় কেউ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল, বারান্দায় যেতেই আলতো করে তুলে নিয়ে গেলো।

আমাদের পরিবারের মানুষজনদের পারিবারিকভাবে একটা বৈশিষ্ট্য আছে – যেকোন বড় সমস্যার সময়ে কেউই ভেঙে পড়ে না, কান্নাকাটিও করে না। দাদু যখন কালেমা পড়ে ঢলে পড়েছেন, তখন ইমদাদ চাচা দাদুকে তুলে এনে শান্ত মুখে সোজা করে শুইয়ে দিচ্ছিলেন, চোখ পাতা বন্ধ করে দিয়ে হাত-পা সোজা করে রাখছিলেন। চাচী বারবার চাচাকে জিজ্ঞেস করছিলেন হাত-পা সোজা করে রাখছেন কেনো। দাদুর মৃত্যুর খবর শুনে যখন আমরা খাবার-দাবার ফেলেই উঠে যাচ্ছিলাম – আব্বা তখন বলছিলেন – তাড়াহুড়ো করে, খাবার অপচয় করে আর কী হবে? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এই ব্যাপারটাকে গুণ-দোষ পর্যায়ে ফেলা যায় কী না সেটা এখনও ঠিক করতে পারিনি কিন্তু মাঝে মাঝেই সেটা খুবই অদ্ভুত লাগে। আগে বিষয়টা বুঝতে পারতাম না – দাদী যখন মারা গেলেন, যখন চিরচেনা রাস্তা ধরে অন্যরকম একটা ঘোর লাগা অনুভূতি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলাম – আমি তখন ভাবছিলাম বাড়িতে অনেক মানুষজন আসবে তাদের কীভাবে ব্যবস্থা করা যায়, ছোটচাচা সিলেট থেকে আসার জন্য গাড়ি পেয়েছেন কী না, আমেরিকায় থাকা চাচাকে খবরটা কে কিভাবে দিয়েছে, কবর কাটা ঠিক মত হচ্ছে কী না। অনেক আগে এক বর্ষায় নানুবাড়ির গ্রামের একজনের কবর দেখেছিলাম, বৃষ্টি-পানি-কাদা মিলে কবরের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ, মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম দাদুর কবর যেনো এমন না হয় ইত্যাদি, ইত্যাদি। একেবারে শেষ পর্যন্ত মনের মাঝে একটা জিনিসই ঘুরপাক খাচ্ছিল – কাজটা ভালোমত শেষ করতে হবে। ইমদাদ চাচা, বড় চাচা, আব্বু সবার মুখেই সেদিন শান্ত, ধীর-স্থির একটা বিষয় ছিল। সব শোককে চেপে রেখে সবাই সেদিন একটা জিনিসই চাইছিলেন – সবকিছু ঠিকঠাক মত হোক।

আজ হরতাল ছিল। দুপুরের দিকে যখন যানচলাচল খানিকটা শুরু হয়েছে তখন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, একা একাই। পাড়ায় পৌছে দাদীর কবরের সামনে গিয়ে যখন দাড়িয়েছি তখন ঘড়িতে বিকেল পৌনে তিনটা বাজে। ঠিক ঠিক এক বছর আগের কথা মনে করে বুকটা এতো হু হু করে উঠল, কখন কেদে ফেলেছি বুঝতে পারিনি। আমি জানি, শুক্রবারে যখন দোয়া হচ্ছিল তখন আরো তীব্র একটা অনুভূতি চাচা-ভাইদের মাঝে ছিল। আমি সেই অনুভূতির অংশ হতে পারিনি – সারাজীবন এই আফসোসটুকু হয়ত থেকে যাবে।

যখন দাদু ছিলেন, বাড়িতে গেলেই অবধারিতভাবে দাদুর সাথেই আগে দেখা হত। আগে দাদু তারপর অন্যরা। এখনও সময় পেলেই বাড়ি যাই, বাড়িতে ঢুকার আগে দাদুর কবরে যাই – এতো মানুষকে মায়ার বাধঁনে জড়ানো মানুষটাকেই প্রথমে দেখার জন্য। দাদু কী আমাকে দেখতে পান?

Advertisements

One comment on “দাদুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী

  1. রিং বলেছেন:

    গভীর সমবেদনা রইলো আপনার ও আপনার পরিবারের সদস্যদের প্রতি। প্রার্থনা করি যেনো সৃষ্টিকর্তা আপনার দাদুর গোনাহ মাফ করে জান্নাত নসীব করেন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s